হাজার বছরের পুরোনো রহস্য—কীভাবে বিলীন হলো বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন ও সমৃদ্ধ নগরসভ্যতা সিন্ধু? অবশেষে সেই প্রশ্নের সম্ভাব্য উত্তর হাজির করলেন ভারতের আইআইটি–গান্ধীনগরের গবেষকেরা। তাঁদের পর্যবেক্ষণ বলছে, দীর্ঘস্থায়ী ও তীব্র খরাই ধীরে ধীরে সিন্ধু সভ্যতার ভিত্তি নড়িয়ে দেয় এবং মানুষকে বাধ্য করে নগরছাড়া হতে।
খরাই ছিল সভ্যতার পতনের কেন্দ্রীয় কারণ
‘কমিউনিকেশনস আর্থ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট’ জার্নালে প্রকাশিত ১১ পৃষ্ঠার গবেষণাপত্রে বলা হয়—ধারাবাহিক পানির অভাব হরপ্পা, মহেঞ্জোদারো, রাখিগড়ি ও লোথালের মতো সুপরিকল্পিত শহরগুলোকে ধসের দিকে ঠেলে দেয়।
আইআইটির গবেষণায় উঠে এসেছে—
-
সভ্যতার অস্তিত্বজুড়ে গড় বৃষ্টিপাত ১০–২০% কমে যায়
-
তাপমাত্রা বাড়ে প্রায় ০.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস
-
৪,৪৫০ থেকে ৩,৪০০ বছর আগে মাত্র ৮৫ বছরের ব্যবধানে চারটি বড় খরা ঘটে
-
সবচেয়ে ভয়াবহ খরাটি স্থায়ী ছিল ১৬৪ বছর এবং এটি সভ্যতার ৯১% অঞ্চলকে প্রভাবিত করে
সিন্ধু সভ্যতার জীবনযাত্রার মূল ভিত্তি ছিল নদীকে ঘিরে কৃষি, বাণিজ্য ও শহুরে অবকাঠামো। কিন্তু দীর্ঘ খরায় নদীর প্রবাহ কমে গেলে মানুষের টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ে।
নদীর কাছে সরে গিয়েও রক্ষা পাওয়া যায়নি
প্রথমে মানুষ বেশি বর্ষাপ্রবণ অঞ্চল থেকে ধীরে ধীরে নদীর আরো কাছে চলে আসে পানির নিশ্চয়তা খুঁজে। কিন্তু খরা তীব্রতর হলে নদীর পানিও কমতে থাকে।
গবেষণায় আরও পাওয়া গেছে—
-
গম–বার্লির বদলে মানুষ চাষ শুরু করে খরা-সহনশীল বাজরা
-
তবুও দীর্ঘ খরার ক্ষতি পূরণ করা সম্ভব হয়নি
-
বড় শহরগুলো ভেঙে পড়ে, জনসংখ্যা ছড়িয়ে পড়ে ছোট গ্রামীণ বসতিতে
হ্রদের স্তর, গুহার স্ট্যালাকটাইট এবং প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ—সবই দেখায় যে খরা ক্রমেই ভয়াবহ হচ্ছিল এবং শেষ পর্যন্ত এটি নগরসভ্যতার পতন ডেকে আনে।
বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনের গভীর প্রভাব
গবেষকদের মতে—
-
এল নিনো
-
উত্তর আটলান্টিকের শীতলতা
-
প্রশান্ত ও ভারত মহাসাগরের তাপমাত্রা বৃদ্ধি
—এসব বৈশ্বিক জলবায়ুগত পরিবর্তন ভারতীয় বর্ষাকে দুর্বল করে দেয়। স্থল–সমুদ্রের তাপমাত্রার ব্যবধান কমে গিয়ে বর্ষা কম আসে, খরা বাড়ে। বায়ুমণ্ডলের সঞ্চালনে পরিবর্তন আর্দ্রতা কমিয়ে খরাকে আরও দীর্ঘায়িত করে।
এক নয়—বহু কারণের যৌথ চাপেই পতন
গবেষকেরা মনে করেন, সিন্ধু সভ্যতার পতন আকস্মিক ছিল না; বরং জলবায়ু পরিবর্তন, সামাজিক চাপ ও অর্থনৈতিক পরিবর্তনের সম্মিলিত প্রভাবে সভ্যতা ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ে।
-
মানুষ বারবার অভিবাসনে বাধ্য হয়
-
কৃষির ধরন বদলায়
-
বাণিজ্যের পথ পরিবর্তিত হয়
তবুও শেষ পর্যন্ত সেই পরিবর্তনগুলো টিকে থাকার জন্য যথেষ্ট ছিল না। একসময়কার সমৃদ্ধ নগরসমূহ ভেঙে গিয়ে রূপ নেয় ছোট ছোট গ্রামীণ সম্প্রদায়ভিত্তিক বসতিতে।
আরও পড়ুন: পাওয়ার বাটন নষ্ট? স্মার্টফোন চালাতে সহজ সমাধানের কার্যকর পদ্ধতি